শিক্ষক কান ধরেছেন, আর আমাদেরটা কাটা গেছে!

শিক্ষক কান ধরেছেন, আর আমাদেরটা কাটা গেছে!

এ কে এম জাকারিয়া | ১৬ মে, ২০১৬

বর্বরতার নানা ভিডিও ফেসবুকে দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমাদের অনুভূতিগুলোও সে কারণে দিনে দিনে ভোঁতা হয়ে আসছে। কোনো কিছুতেই আমাদের যেন কিছু আসে–যায় না। এই ভোঁতা অনুভূতির মধ্যেই আমাদের সামনে হাজির হয়েছে নতুন এক ভিডিও। নারায়ণগঞ্জে নিজের স্কুলে কান ধরে ওঠবস করতে বাধ্য হচ্ছেন এক শিক্ষক। তিনি সেই বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকও। তিনি কান ধরে ওঠবস করছেন, তাঁর ঠিক সামনে দাঁড়ানো একজন আইনপ্রণেতা যিনি কান ধরে ওঠবস করার বিষয়টি তদারকি করছেন। পাশেই আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যরা, চারপাশে শত শত লোক। মাঝেমধ্যে স্লোগান উঠছে, ‘জয় বাংলা’।
এই দৃশ্য দেখা যায় না, ভোঁতা অনুভূতি নিয়েও অসহ্য ঠেকে। আমাদের সব প্রতিবাদ আর প্রতিক্রিয়া এখন ফেসবুকে এসে ঠেকেছে। এ নিয়েও তাই হচ্ছে। আমার এক বন্ধু (কবির হোসেন তাপস) চরম মনঃকষ্ট থেকে এ নিয়ে একটি কবিতা লিখেছেন, শেয়ার করেছেন ফেসবুকে। শিরোনাম ‘বাংলাদেশ কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে’। লিখেছেন
‘কান ধরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে যেন শ্যামল কান্তি নয়!
…কে যেন আমাকে ফিসফিস করে বলছে
বাংলাদেশ তুমি কান ধরে দাঁড়িয়ে আছ।’
কী করেছেন নারায়ণগঞ্জের মদনপুরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত? যে কারণে একজন আইনপ্রণেতা ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর লোকজনের উপস্থিতিতে এমন বেআইনি কাজ ঘটে! যে ধরনের অভিযোগ থাকলে বেআইনি কাজও সমাজে জায়েজ হয়ে যায়, সে ধরনের অভিযোগই আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি নাকি ধর্মের অবমাননা করেছেন। কেমন জানি খটকা লাগে। একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক, যিনি এই স্কুলটিকে দীর্ঘ ১৭–১৮ বছর ধরে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন, তাঁর তো বাস্তব বুদ্ধি–বিবেচনার অভাব থাকার কথা নয়। তিনি ধর্ম অবমাননা করতে যাবেন কোন দুঃখে? তাঁর মানসিক বৈকল্য ঘটেছে, এমন কোনো প্রমাণও নেই। আর তেমন কিছু হলে তো তিনি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না।
প্রথম আলোর নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম, আসলে ধর্ম অবমাননার বিষয়টি বানানো। এই শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছেন। স্কুলটিকে বর্তমান অবস্থায় আনার পেছনের মূল কৃতিত্বই তাঁর। এমনকি শুরুতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী জোগাড় করার কাজও করেছেন তিনি। আমাদের দেশে এ ধরনের স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে যা হয়, এটাও তার বাইরে ছিল না। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মধ্যে দলাদলি ও ভাগাভাগি রয়েছে, রয়েছে নানা স্বার্থের বিরোধ। দ্বন্দ্ব রয়েছে পরিচালনা কমিটির সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের। বর্তমান প্রধান শিক্ষককে সরাতে পারলে কোনো পক্ষের নিজের কোনো প্রার্থীকে বসানো যাবে, এটা তো খুব সহজ হিসাব। বোঝা যায়, এমন কোনো হিসাব–নিকাশ থেকেই শ্যামল কান্তিকে সরানো দরকার হয়ে পড়েছিল কোনো গোষ্ঠীর।
এ ধরনের কিছু করার জন্য পরিস্থিতি তৈরি করতে হয় এবং সেটাই করা হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়াকে কেন্দ্র করেই ঘটনা শুরুটা হয়েছে বলে জানলাম। দশম শ্রেণির ক্লাসে এক শিক্ষক যখন পড়াচ্ছিলেন, তখন প্রধান শিক্ষক দেখতে পান যে কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষকের কথায় মনোযোগ না দিয়ে দুষ্টমি করছে। এরপর প্রধান শিক্ষক সেই শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিয়েছেন। সেই শাস্তি কতটা বিধিসম্মত হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, কিন্তু শুরুটা এখান থেকেই এবং এর সুযোগ নিয়েছে একটি গোষ্ঠী। এরপর গত শুক্রবার সকালে মসজিদের মাইক থেকে প্রধান শিক্ষকের ধর্ম অবমাননার ঘোষণাটি আসে। কয়েকজন ছাত্র এ কাজটি করে।
এরপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। পরিকল্পনাটি যে নিখুঁত, সেটাও টের পাওয়া যায়। স্থানীয় সাংসদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই এই চূড়ান্ত অসভ্যতা, বর্বরতা ও বেআইনি ঘটনাটি ঘটেছে। প্রধান শিক্ষক নির্যাতন ও মারধরের শিকার হয়েছেন, শেষ পর্যন্ত কান ধরে ওঠবস করতে করতে জ্ঞান হারিয়েছেন। এখন তিনি হাসপাতালে। চিকিৎসা হয়তো তাঁকে শারীরিক স্বস্তি দেবে। কিন্তু তাঁর মনের অবস্থাটা কী, আমরা একবার অনুমান করতে পারি! আমরা এখন এমন এক অবস্থার মধ্যে পড়েছি যে অন্যায় ও অবিচারের প্রতিকার বা বিচারের দাবি ওঠাও আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিচার পাওয়া যাবে না জেনে কেউ কেউ সরবেই বলছেন ‘বিচার চাই না’। আর আমরা অনেকেই চুপ মেরে আছি। কিন্তু আমরা কি বুঝতে পারছি যে শিক্ষক হয়তো কান ধরেছেন, আর আমাদের সবার কানটাই যে কাটা গেছে!

http://m.prothom-alo.com/opinion/article/860443/%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%95-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A7%87

Be the first to comment on "শিক্ষক কান ধরেছেন, আর আমাদেরটা কাটা গেছে!"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*